
বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় কমিটির শোকসভায় বক্তারা কমিউনিস্ট বিপ্লবীনেতা কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুল)-আত্মত্যাগ ও তাত্ত্বিক নেতৃত্ব প্রদানে অনন্য উদাহরণ।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আপসহীন বিপ্লবী নেতা কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুুল) দীর্ঘ ৫৫ বছর চলৎ শক্তিহীন অবস্থায় এদেশের বিপ্লবী আন্দোলন অগ্রসর করার ক্ষেত্রে মাকর্সবাদ-লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠায় তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করে যে উদাহরণ তৈরি গেছেন তা শুধু এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনেই নয় কমিউনিস্ট আন্দোলনেই অনন্য।
১৭ এপ্রিল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে প্রয়াত কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুল)-এঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও শোকসভা আয়োজক জাতীয় কমিটি আয়োজিত শোকসভায় বক্তারা এ কথা বলেন। শোকসভা আয়োজক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ডাঃ এম. জাহাঙ্গীর হোসেন। শুরুতে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয় ও তার জীবনী পাঠ করেন তফাজ্জল হোসেন। শোকসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বিডি রহমত উল্লাহ, সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এ্যাডঃ মনসুর হাবীব, ভাসানী পরিষদের আহ্বায়ক ডা. হারুন অর রশিদ, শহীদ বুদ্ধিজীবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদ-এর আহ্বায়ক হাসান ফখরী, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খলিলুর রহমান, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শ্যামল কুমার ভৌমিক, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক রহিমা জামাল, কন্ঠশিল্পী কৃষ্ণকলি, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সভাপতি জাফর হোসেন, প্রয়াতে বোন জেবুন্নেছা, কবি মোজাফ্ফর আহমেদ বাবু, জাতীয় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা এডভোকেট মনসুরুল হাই সোহান প্রমুখ। সভাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন শাহজাহান কবির ও প্রকাশ দত্ত।

শোকসভায় বক্তাগণ বলেন, আজ বিশ্বব্যাপি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ার প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাজার ও প্রভাব বলয় নিয়ে ইউক্রেনযুদ্ধ, প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলের আগ্রাসন, ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ যা আঞ্চলিকযুদ্ধের ধারায় পারমাণবিকযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করছে। এই বিরুদ্ধে বিশে^র দেশে দেশে জনগণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় ক্ষেত্রে সম্ভাব্যযুদ্ধে সম্পৃক্ত করার বিপদ যেমন বাড়ছে তেমনি আমাদের দেশে অর্থনীতির সঙ্কট ঘনীভূত হয়ে দ্রব্যমূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি, জ¦ালানী সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ, বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জনগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভকে সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক জনগণের রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অগ্রসর করতে আহ্বান জানানো হয়।
কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুল)-এর জীবনের উপর আলোকপাত করে বক্তারা বলেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরোর সদস্য। তিনি ১৯৫১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থানার পদ্মাপাড়ের ফারাকপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দৌলতপুর মহসিন স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে মেট্রিক এবং ১৯৬৯ সালে বিএল কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। ১৯৬৯-৭০ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবস্থায় পার্টি বিপ্লব অগ্রসর করার লক্ষ্যে ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে সার্বক্ষণিক কর্মি হিসেবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।
সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৫৩ সালে কমরেড স্ট্যালিনের মৃত্যু এবং ১৯৫৪ সালে সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভচক্র ক্ষমতাসীন হয়ে ১৯৫৬-এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬০-এর দশকে ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ সংশোধনবাদ-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক এই মহাবিতর্কে কমরেড আবদুল হক-এর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর বিকল্প বিপ্লবী ধারা অগ্রসর করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে খুলনায় মন্ত্রী সবুর খানের বাড়ী ঘেরাও কর্মসূচির রূপকার ও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন।
১৯৭০-৭১ সালে পার্টির খুলনা জেলা কমিটির নবীন ও সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭১ সালের বিপ্লবী যুদ্ধে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। এ সময়ে ২৬ নভেম্বর ১৯৭১ সালে কমরেড রউফ গুলিতে আহত হন। আহত হয়ে প্যারালাইজড অবস্থায় তাঁকে স্ট্রেচারে করে চলাচল করতে হতো। বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৭২ সালে কমরেড রউফকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। চিকিৎসায় কমরেড আব্দুর রউফ জীবনে বেঁচে গেলেও তাঁর নিম্নাঙ্গ অর্থাৎ মেরুদ-ের নীচের অংশ দুই পা অকার্যকর হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতেন। দেশে ফিরে আসার পর প্রথমে তিনি খুলনা জেলা পার্টির সাথে যুক্ত হন।
বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কমরেড আবদুল হক-এর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর আন্তর্জাতিকতাবাদী লাইনের পক্ষে কমরেড রউফ দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘তিন বিশ্ব তত্ত্ব’-এর বিরুদ্ধে কমরেড আবদুল হক-এর নেতৃত্বে পার্টির তুলে ধরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদী লাইনকে প্রতিষ্ঠায় তিনি নেতৃত্বকারী ভূমিকা রাখেন। তিনি কমরেড আবদুল হক-এর জীবদ্দশায় কমরেড আব্দুর রউফ পার্টির ৮ম কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৯ম কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে অব্যাহত থাকেন। শারীরিক কারণে ২০০৬ এবং ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত দশম ও একাদশ কংগ্রেসে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে না থাকলেও কার্যত তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর তাত্ত্বিক নেতা।
দীর্ঘ দিন বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগে অবশেষে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গতকাল ৫ ফেব্রুয়ারি ’২৬ সকাল ৯টা ৪০মিনিটে ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রয়াত নেতার মরদেহে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে খুলনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
