ক্রীড়া ডেস্ক : ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ৪৮টি দল, ১২টি গ্রুপ এবং তিনটি আয়োজক দেশ—সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টটি কেবল ফুটবল নয়, এক বিশাল বৈশ্বিক মহাযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। গ্রুপ পর্বেই এবার দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যেখানে ফেভারিট দলগুলোর পাশাপাশি একাধিক ডার্ক হর্স তৈরি করছে অঘটনের সম্ভাবনা।
এবার গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘কোনো গ্রুপই সহজ নয়’। প্রতিটি গ্রুপেই অন্তত একটি করে দল রয়েছে, যারা বড় দলকে চাপে ফেলতে পারে বা অঘটন ঘটাতে পারে।
গ্রুপ A: আয়োজক মেক্সিকোর চাপ ও প্রত্যাশা
আয়োজক দেশ হিসেবে মেক্সিকো স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি চাপ ও প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে। উদ্বোধনী ম্যাচ তাদের জন্য বড় সুযোগ হলেও সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে যেতে না পারার ব্যর্থতা এখনো প্রশ্ন হয়ে আছে।
এ গ্রুপে দক্ষিণ কোরিয়া ধারাবাহিকভাবে বড় মঞ্চে ভালো পারফর্ম করে আসছে। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্রের মতো ইউরোপিয়ান দল বড় ম্যাচে অঘটন ঘটাতে সক্ষম। ফলে এই গ্রুপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়।
গ্রুপ B: কানাডার স্বপ্ন, সুইস বাধা
নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বড় সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে নামছে কানাডা। তবে ইউরোপের অভিজ্ঞ শক্তি সুইজারল্যান্ড এই গ্রুপের ফেভারিটদের অন্যতম।
কাতার ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনা প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে মধ্যম শক্তির দলগুলো এখানে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
গ্রুপ C: ব্রাজিলের সামনে কঠিন পরীক্ষা
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল এবারও শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কিন্তু গ্রুপ পর্বেই তাদের সামনে কঠিন বাধা।
২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো এখন আর কোনো আন্ডারডগ নয়, তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি। স্কটল্যান্ডের শারীরিক ফুটবল এবং হাইতির অপ্রত্যাশিত আক্রমণ এই গ্রুপকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
গ্রুপ D: যুক্তরাষ্ট্রের হোম চ্যালেঞ্জ
আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী তরুণ স্কোয়াড নিয়ে খেলছে। তবে তাদের পথ সহজ নয়।
তুরস্ক ইউরোপের উদীয়মান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া এবং প্যারাগুয়ে, দুটি দলই শারীরিক ও দ্রুতগতির ফুটবলে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ।
গ্রুপ E: জার্মানির পুনর্জাগরণের মঞ্চ
দুই বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর জার্মানি এবার ঘুরে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু আফ্রিকার শক্তিশালী দল আইভরি কোস্ট এবং লাতিন আমেরিকার ধারাবাহিক দল ইকুয়েডর তাদের জন্য বড় বাধা।
এছাড়া কুরাসাও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গ্রুপ F: সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ লড়াই
নেদারল্যান্ডস এখানে ফেভারিট হলেও জাপান সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে বড় দলকে হারানোর ইতিহাস তৈরি করেছে।
সুইডেন ও তিউনিসিয়া শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবলের জন্য পরিচিত। ফলে এই গ্রুপে পয়েন্ট হারালেই বিদায়ের ঝুঁকি।
গ্রুপ G: বেলজিয়ামের শেষ অধ্যায়?
বেলজিয়াম-এর ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর জন্য এটি শেষ বড় সুযোগ হতে পারে। তবে মিশর ও ইরান বড় অঘটনের ক্ষমতা রাখে। নিউজিল্যান্ডের মতো দলও এখানে সহজ প্রতিপক্ষ নয়।
গ্রুপ H: ইউরোপ-দক্ষিণ আমেরিকার শক্তির লড়াই
স্পেন ও উরুগুয়ে—দুটি বিশ্বকাপজয়ী শক্তি একই গ্রুপে। এখানে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই বড় অঘটনের ইতিহাস লিখেছে। কেপ ভার্দেও নিজেদের প্রমাণ করতে প্রস্তুত।
গ্রুপ I: সম্ভাব্য ‘গ্রুপ অব ডেথ’
বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেয়ে কঠিন গ্রুপ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এখানে ফেভারিট হলেও তাদের পথ সহজ নয়।
সেনেগাল আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি। নরওয়ে-তে আছেন আরলিং হালান্ডের মতো বিশ্বমানের তারকা। ইরাকও লড়াইয়ের মাধ্যমে চমক দিতে পারে।
গ্রুপ J: আর্জেন্টিনার নতুন ইতিহাসের মিশন
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার টানা দ্বিতীয় শিরোপার লক্ষ্যে। ১৯৬২ সালের পর কেউ এই কীর্তি করতে পারেনি।
অস্ট্রিয়া ও জর্ডান এই গ্রুপে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে প্রতিটি ম্যাচেই চাপ থাকবে আর্জেন্টিনার ওপর।
গ্রুপ K: পর্তুগাল বনাম কলম্বিয়ার লড়াই
পর্তুগাল ও কলম্বিয়া—দুটি দলই আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত। উজবেকিস্তান প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে নতুন ইতিহাস লিখতে চায়। কঙ্গোও দীর্ঘদিন পর ফিরে এসেছে, যা গ্রুপটিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
গ্রুপ L: ইংল্যান্ডের কঠিন পথ
ইংল্যান্ড ফেভারিট হলেও তাদের গ্রুপ মোটেও সহজ নয়।
ক্রোয়েশিয়া বড় টুর্নামেন্টে সবসময়ই শক্ত প্রতিপক্ষ। ঘানা আফ্রিকার অন্যতম বিপজ্জনক দল, আর পানামা প্রতিবারই উন্নতি করছে।
৪৮ দলের এই বিশ্বকাপ ফুটবলকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়। এখন আর কোনো গ্রুপই সহজ নয়। প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠতে পারে টার্নিং পয়েন্ট।
এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হবে ফেভারিটদের চাপ সামলানো এবং ডার্ক হর্সদের উত্থান। আর সেই অপ্রত্যাশিত গল্পগুলোই হয়তো আবারও বিশ্বকে মনে করিয়ে দেবে, বিশ্বকাপ কেন সত্যিই ‘The Greatest Show on Earth’।
<p>..</p>
Copyright © 2025 All rights reserved ভোরের আলো