
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন দপ্তরে সংস্কারের আলোচনা চললেও গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে উঠেছে ভিন্নধর্মী অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, পুরনো প্রভাববলয় এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং সেই বলয়ের সুবিধাভোগীদের একজন হিসেবে উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের নাম।
হারুন অর রশিদ আগে রাজশাহী ও বাগেরহাটে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন—এমন তথ্য তার পরিচিতদের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে উঠে এসেছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি তাকে “সাবেক সফল সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বুয়েট শাখা” পরিচয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এমনকি রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে গোমস্তাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ তার কার্যালয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর ছবিও প্রকাশিত হয়।
চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হারুন অর রশিদকে জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে রাজশাহী থেকে নারায়ণগঞ্জে পদায়ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম আতিকের ঘনিষ্ঠতার কারণেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে আসীন হন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণপূর্তের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, যেখানে শামীম আখতার ও আতিকুল ইসলাম আতিকের নাম বারবার সামনে এসেছে।
অভিযোগের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৪ থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত হারুন অর রশিদের অধীনে প্রায় ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ২১টি কাজ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে গেছে। এর মধ্যে Adroit Consultants and Engineers, ACE-AT JV এবং The Engineers and Architects নামে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, Adroit প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আতিকুল ইসলাম আতিকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই সূত্রেই কাজ বণ্টনে প্রভাব খাটানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, এবং সেটিকেই রেসপন্সিভ ঘোষণা করে কাজ প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারা নতুন নয়; বরং রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালের অভিযোগের সঙ্গেই এর মিল পাওয়া যায়।
গত ১০ মার্চ ২০২৫ তারিখে ছয়টি কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়—পাঁচটি LTM ও একটি OTM পদ্ধতিতে। অভিযোগ অনুযায়ী, ছয়টির সবগুলোই Adroit পায় এবং ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে একযোগে নোটিশ অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) প্রদান করা হয়। আরও কয়েকটি টেন্ডারে একক দরপত্র জমা পড়ে এবং সেটিকেই রেসপন্সিভ ঘোষণা করে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান, সিডিউল বিক্রি ও জমা—সব পর্যায়েই মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের ৯ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহীতে গণপূর্ত বিভাগের একটি ভবনের নির্মাণকাজ দরপত্র আহ্বানের আগেই শুরু হয়ে যায়। কাজ শেষের দিকে এসে টেন্ডার ডাকা হয়। ঠিকাদার সঞ্জয় কুমার তখন স্বীকার করেন যে ঝুঁকি নিয়েই কাজ শুরু করেছিলেন। হারুন অর রশিদ ব্যাখ্যা দেন, জুন ক্লোজিংয়ের তাগিদে চুক্তিপত্র সইয়ের আগেই কাজ শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল গোফফার একে অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এছাড়া হারুন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই কোটা আন্দোলন ঘিরে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে তার স্বাক্ষর ছিল বলে জানা যায়। তিনি আইইবি ২০২২-২৩ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (সবুর-মঞ্জুর প্যানেল) ব্যানারে প্রার্থীও হয়েছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার তার দায়িত্বকালে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে ভূমিকা রেখেছেন। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আতিকুল ইসলাম আতিক শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ কর্মরত থেকে একটি টেন্ডার সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের প্রায় ১১০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও টেন্ডারবাজির প্রস্তুতির অভিযোগ উঠেছে।
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদার ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বদলি বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এমনকি উচ্চপর্যায়ের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের কথাও শোনা যাচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সচিব নজরুল ইসলাম এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
রাজশাহী থেকে পদায়ন হয়ে আসার পর কিছু সময় তুলনামূলক নীরব থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি আবারও পুরোনো ধাঁচে সক্রিয় হয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দাবি, শুরুতে পরিস্থিতি বুঝে কিছুদিন অপেক্ষাকৃত সংযত থাকলেও বর্তমানে তিনি আবারও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কাজ বণ্টন এবং একক দরপত্রকে বৈধতা দেওয়ার মতো আগের পদ্ধতিগুলো নতুন করে চালু করেছেন। অর্থাৎ, মাঝখানে সাময়িক বিরতি থাকলেও এখন তিনি আগের সেই প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ভূমিকায় ফিরে এসেছেন বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।
সংস্কারের আলোচনার মাঝেই গণপূর্ত অধিদপ্তরে এই ধারাবাহিক অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রভাব কি এখনও অটুট? আর যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও জবাবদিহি কবে নিশ্চিত হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
